বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
ভূমিকম্পে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম
চলমান জানুয়ারি মাসের প্রথম সাত দিনে বাংলাদেশে দুবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জানুয়ারি সকালে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্প ছিল তীব্র ধরনের, এবং ৩ জানুয়ারির ভূমিকম্পটি ছিল মাঝারি মাত্রার। এই দুটি ভূমিকম্পেরই উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ বড় ধরনে
র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ৭ জানুয়ারির ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল চীনের জিজাং এলাকা এবং ৩ জানুয়ারির ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের হোমালিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। ঘনবসতি, পুরোনো অবকাঠামো এবং বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ঝুঁকিতে দেশ
বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে রিখটার স্কেলে ৭-এর ওপরে পাঁচটি বড় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এর পর থেকে বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আগে এ ধরনের নীরবতা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হতে পারে।
২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা ৬০টি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটি ছিল ৪ মাত্রার ওপরে এবং ৩১টি ছিল ৩ থেকে ৪ মাত্রার মধ্যে। শহর এলাকায় অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এই ঝুঁকিকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ শহর ঢাকা
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম। ঢাকার অনেক ভবন দুর্বল কাঠামো এবং নকশার মান পূরণে ব্যর্থ। বিশেষত মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, রামপুরা, মতিঝিল এবং খিলগাঁওয়ের মতো এলাকায় ভূমিকম্পের সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকাগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই এলাকাগুলোতে একটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প পুরো দেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তঃদেশীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন
২০২৪ সালের মার্চে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (MoDMR) বাংলাদেশে আন্তঃদেশীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন চালু করে। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যালয় (UNDRR) এবং গ্লোবাল ভূমিকম্প মডেল (GEM) ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এই উদ্যোগটি ভূমিকম্পের ঝুঁকির মানচিত্র এবং ভবনের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে।
দুর্বলতা
মূল্যায়নে বাংলাদেশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে:
ভঙ্গুর অবকাঠামো: হাসপাতাল, জরুরি প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র এবং সরকারি দপ্তরগুলো ভূমিকম্পের ধাক্কা সহ্য করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি: বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ এবং দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
জনসচেতনতার ঘাটতি: ভূমিকম্প পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, সে সম্পর্কে অনেক নাগরিকের পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি কমাতে একটি সমন্বিত এবং বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
শক্তিশালী বিল্ডিং কোড প্রণয়ন ও প্রয়োগ: ভবন নির্মাণে কঠোর মানদণ্ড নিশ্চিত করা।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।
অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ: হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলো ভূমিকম্প-প্রতিরোধী করার জন্য বিশেষ বরাদ্দ।
বেসামরিক-সামরিক সমন্বয়: বিপর্যয়ের সময় দ্রুত এবং দক্ষ প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ।
উপসংহার
আন্তঃদেশীয় মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যদি যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।
.webp)
0 Comments
Thank for with us.